টক্সিক হাই-পারফর্মার

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

টক্সিক হাই-পারফর্মার

সকাল ১০টা। ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ফ্লোরে জনাব মোঃ আবুল কাশেম হৃদয় দাঁড়িয়ে আছেন। তার তীক্ষ্ণ নজরে মেশিনের প্রতিটি মুভমেন্ট ধরা পড়ছে। হঠাৎ একজন অপারেটর সামান্য ভুল করতেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “এই যে আপনাদের কোম্পানির লোকজনের অবস্থা! এক সপ্তাহের কাজ দশ দিনেও শেষ হয় না। আরে ভাই, আমি আগের যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ছিলাম, সেখানে এই কাজ আধা ঘণ্টায় শেষ হতো। আপনাদের এই কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট আসলে গর্দভ, তাই আপনাদের মতো অকর্মণ্যদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিচ্ছে!”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়র অফিসার কাঁচুমাচু হয়ে কিছু বলতে গেলে হৃদয় সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বিদ্রূপের সুরে বললেন, “বেশি কথা বলবেন না। আপনাদের কোম্পানিতে তো শুধু ‘বালিশ খেলা’ চলে। কাজ নিজের ঘাড়ে আসলে অন্যের দিকে পাস করে দিতে পারলেই আপনারা খালাস। আসলে এই কোম্পানির সবাই চোর, সুযোগ পেলেই ফাঁকি দেয়। আমি এখানে আছি বলেই কোনোমতে প্রোডাকশন টিকে আছে।”

জুনিয়র অফিসারটি মাথা নিচু করে চলে গেল। জনাব হৃদয়ের দক্ষতায় প্রোডাকশন হয়তো বাড়ছে, কিন্তু তার প্রতিটি কথা যেন বিষের মতো কর্মীদের মনে বিঁধছে। দীর্ঘদিন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পরও তার মুখে যখন "আমাদের কোম্পানি" না এসে বারবার "আপনাদের কোম্পানি" শব্দটা আসে, তখন প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিমূলেই কুঠারাঘাত লাগে। একজন আন্তর্জাতিক মানের এইচআর স্পেশালিস্টের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষোভ নয়, বরং একটি গভীরতর সাংগঠনিক ও মানসিক ব্যাধি।

১. দ্য মিথ অব ‘টক্সিক হাই-পারফর্মার

ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানে একটি বহুল আলোচিত তত্ত্ব হলো "Performance vs. Values Matrix"। এখানে কর্মীদের চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। যারা উচ্চ মানের কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ ধারণ করেন, তারা হলেন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ। কিন্তু জনাব হৃদয়ের মতো যারা উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন অথচ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, তাদের বলা হয় 'টক্সিক হাই-পারফর্মার'।

জনাব হৃদয়ের কারিগরি জ্ঞান হয়তো ফ্যাক্টরির গ্রাফ ওপরের দিকে রাখছে, কিন্তু তার আচরণ প্রতিষ্ঠানের অদৃশ্য কাঠামোকে ধসিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক এইচআর স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য ‘কালচারাল ফিট’ কারিগরি দক্ষতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়ে বাড়ানো যায়, কিন্তু লালিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।

২. মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: ‘আপনাদের কোম্পানি’ বনাম ‘আমাদের কোম্পানি’

জনাব হৃদয়ের কথায় বারবার "আপনাদের কোম্পানি" শব্দটির ব্যবহার একটি ভয়াবহ মানসিক দূরত্ব নির্দেশ করে। একে এইচআর-এর ভাষায় বলা হয় "Lack of Psychological Ownership"।

 * বিচ্ছিন্নতা (Alienation): দীর্ঘদিন কাজ করার পরও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের অংশ মনে করেন না। তিনি নিজেকে একজন উদ্ধারকর্তা বা 'আউটসাইডার' হিসেবে দেখেন, যিনি দয়া করে এই 'খারাপ' কোম্পানিটিকে টেনে তুলছেন।

 * সুপারিওরিটি কমপ্লেক্স: তার পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প শোনানো এবং বর্তমান সহকর্মীদের তুচ্ছজ্ঞান করা মূলত তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের একটি অপকৌশল।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব

একটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ওপর থেকে নিচে প্রবাহিত হয়। জনাব হৃদয়ের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ পদের মানুষ যখন প্রকাশ্য দিবালোকে নেতিবাচকতা ছড়ান, তখন তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী:

 * মনোবল বিনাশ: যখন অধীনস্থরা শোনেন তাদের বসই কোম্পানিকে গালি দিচ্ছেন, তখন তাদের মনে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা বা দায়বদ্ধতা থাকে না।

 * গসিপ কালচার ও বিভাজন: "সবাই চোর" বা "ম্যানেজমেন্ট গর্দভ"—এই ধরণের মন্তব্য কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করে। ফলে দলগত কাজের (Teamwork) বদলে একে অপরকে দোষারোপ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

৪. কেস হিস্ট্রি: একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ (দ্য স্টার ইঞ্জিনিয়ার কেস)

ইউরোপের একটি অটোমোবাইল ফ্যাক্টরিতে প্রায় একই রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেখানকার হেড অফ ডিজাইন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু তার স্বভাব ছিল জনাব হৃদয়ের মতোই উদ্ধত। তিনি সবসময় বলতেন, "এই কোম্পানি আমার মেধার যোগ্য নয়।"

কোম্পানিটি শুরুতে তার মেধার কথা ভেবে সব সহ্য করত। কিন্তু এক বছর পর দেখা গেল, ওই বিভাগের সবচেয়ে সৃজনশীল ৫ জন তরুণ ইঞ্জিনিয়ার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তারা এক্সিট ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন, ওই সিনিয়রের অবমাননাকর কথা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা কাজ করার উৎসাহ হারিয়েছেন। কোম্পানিটি তখন হিসেব করে দেখল, ওই সিনিয়রের মেধার চেয়েও বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে দক্ষ কর্মী হারানোর ফলে। শেষ পর্যন্ত তাকে কঠিন শর্ত দিয়ে শোকজ করা হয় এবং পরবর্তীতে তাকে সরিয়ে দিয়ে এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয় যার দক্ষতা হয়তো কিছুটা কম কিন্তু তিনি টিমকে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। ফলাফল হিসেবে দেখা গেল, দুই বছরের মধ্যে ওই বিভাগটি রেকর্ড পরিমাণ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।

৫. একজন ক্যারিয়ার কাউন্সিলরের দৃষ্টিকোণ: হৃদয়ের ক্যারিয়ার কি নিরাপদ?

জনাব হৃদয় হয়তো ভাবছেন তার প্রোডাকশন রিপোর্ট তাকে আজীবন সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

 * লিডারশিপের সীমাবদ্ধতা: একজন লিডার কাজ আদায় করেন না, বরং মানুষ তৈরি করেন। জনাব হৃদয় মানুষকে ছোট করছেন, যা তার লিডারশিপ ব্যর্থতার প্রমাণ। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চপদে যাওয়ার জন্য ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স (EQ) অপরিহার্য, যা তার মধ্যে একেবারেই অনুপস্থিত।

 * ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: বর্তমান যুগে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনো এমপ্লয়ি যদি দীর্ঘদিন কাজ করার পরও প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিষোদগার করেন, তবে পরবর্তী কোনো ভালো প্রতিষ্ঠান তাকে নিয়োগ দিতে ভয় পায়। তারা ভাবেন, "এই ব্যক্তিটি আমাদের এখানে এসেও একই আচরণ করবে।"

৬. একজন এইচআর হিসেবে সুপারিশ ও সমাধান

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এইচআর বিভাগকে কঠোর ও কৌশলী হতে হবে:

 * কঠোর ফিডব্যাক (Crucial Conversation): তাকে ডেকে সোজাসুজি বলতে হবে যে, "আপনার প্রোডাকশন চমৎকার, কিন্তু আপনার ল্যাঙ্গুয়েজ ও বিহেভিয়ার আমাদের কালচার নষ্ট করছে। এটি চলতে থাকলে কোম্পানি আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।"

 * পজিটিভ এনগেজমেন্ট: তাকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে যে, তিনি যে "বালিশ খেলা" বা ফাঁকি দেওয়ার কথা বলছেন, সেগুলো রোধ করতে তিনি কী কী পদক্ষেপ নিতে চান তার একটি প্রেজেন্টেশন দিতে। এতে তার নেতিবাচক সমালোচনা গঠনমূলক কাজে রূপান্তর হতে পারে।

 * সাকসেশন প্ল্যানিং: কোনো কর্মীকে কখনোই 'অপরিহার্য' হতে দেওয়া উচিত নয়। এইচআর-এর উচিত জনাব হৃদয়ের সমান্তরালে অন্য কাউকে তৈরি করা, যাতে তিনি মনে না করেন যে তাকে ছাড়া ফ্যাক্টরি অচল।

একজন দক্ষ মানুষ যখন তার প্রতিষ্ঠানকে অবজ্ঞা করেন, তখন তিনি মূলত তার নিজের কর্মক্ষেত্রকেই অপবিত্র করেন। জনাব মোঃ আবুল কাশেম হৃদয়কে বুঝতে হবে যে, তিনি যে গাছের ডালে বসে আছেন, সেই ডালটিকেই তিনি কুড়াল দিয়ে কাটছেন।

একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কেবল মুনাফা খোঁজে না, তারা একটি স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশও খোঁজে। জনাব হৃদয়ের মতো কর্মীদের দক্ষতা প্রতিষ্ঠানের জন্য সাময়িক আশীর্বাদ হলেও তাদের আচরণ দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপ। তাই তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত, তবে প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে এবং কালচার রক্ষার খাতিরে কোনো একক ব্যক্তির উদ্ধত আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া কখনোই সমীচীন নয়। কারণ, টেকনিক্যাল স্কিল দিয়ে ফ্যাক্টরি চলে, কিন্তু মানুষের সম্মান ও ঐক্য দিয়ে কোম্পানি চলে।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default